জমি দখলে অন্তঃসত্ত্বা নারীকে নির্যাতন, গর্ভপাত

শেরপুর প্রতিনিধি

শেরপুরের নকলায় গাছের সঙ্গে বেঁধে অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূ নির্যাতন ও গর্ভপাতের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় পুলিশের দায়িত্বে অবহেলার বিষয়টি খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের কমিটি করেছে জেলা পুলিশ। এ ঘটনায় ৯ জনকে আসামি করে মামলা করেছেন নির্যাতনের শিকার নারী। ওই মামলায় এক নারীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ওই নির্যাতনের একটি ভিডিও চিত্র স্থানীয়দের মুঠোফোনে ছড়িয়ে পড়েছে।

গ্রেপ্তার নারীর নাম নাসিমা আক্তার। তিনি উপজেলার ভূরদী গ্রামের আবদুল মোতালেবের মেয়ে। আজ বুধবার দুপুরে নকলা থানা-পুলিশ তাকে ভূরদী গ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করে। ‘নির্যাতনের শিকার’ ওই গৃহবধূর নাম ডলি খানম (২২)। তিনি উপজেলা সদরের কায়দা এলাকার মো. শফিউল্লাহর স্ত্রী ও স্থানীয় চন্দ্রকোনা কলেজের স্নাতক শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী।

মামলার এজাহার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কায়দা এলাকার মৃত হাতেম আলীর ছোট ছেলে মো. শফিউল্লাহর সঙ্গে জমি নিয়ে তার বড় ভাই আবু সালেহ, সলিমউল্লাহ ও নেছার উদ্দিনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ ও মামলা চলে আসছিল। এর জেরে গত ১০ মে সকালে শফিউল্লাহর দখলে থাকা জমির বোরো ধান জোর করে কাটতে যান সালেহ ও তাঁর লোকজন। এ সময় শফিউল্লাহ প্রথমে বাধা দেন। তবে প্রতিপক্ষের ধাওয়ায় তিনি পিছু হটে নকলা থানায় যান। একপর্যায়ে সালেহর লোকেরা ধান কাটা শুরু করলে শফিউল্লাহর তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ডলি খানম তাদের বাধা দিতে যান। এ সময় সালেহর নির্দেশে সলিমউল্লাহ, নেছারউদ্দিন ও তার স্ত্রী লাকি আক্তারসহ অন্যান্যরা ডলিকে ঘেরাও করেন। একপর্যায়ে তারা ডলির চোখে-মুখে মরিচের গুঁড়া ছিটিয়ে দেন। এরপর তারা ডলিকে টেনে-হিঁচড়ে পাশের খেত সংলগ্ন ইউক্যালিপটাস গাছের সঙ্গে দুই হাত এবং অন্য একটি গাছের সঙ্গে দুই পা বেঁধে ফেলেন।

পর ডলির শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারধর করা হয়। এতে ডলি গুরুতর আহত হন এবং ঘটনাস্থলেই তাঁর গর্ভপাত হয়। সংবাদ পেয়ে নকলা থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। এ সময় পুলিশ গুরুতর অবস্থায় ডলিকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠায় এবং ঘটনায় জড়িত থাকার দায়ে সালেহ ও তাঁর ছোট ভাইয়ের স্ত্রী লাকিকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। তবে আটক করার কিছুক্ষণ পরে ওই দুজনকে পুলিশ ছেড়ে দেয়।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ১০ মে থেকে ১৬ মে পর্যন্ত নকলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং ১৬ মে থেকে ২২ মে পর্যন্ত জেলা সদর হাসপাতালে ডলিকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। জেলা সদর হাসপাতাল থেকে ২২ মে রোগীর দেওয়া ছাড়পত্রে উল্লেখ করা হয় শারীরিক নির্যাতনের ফলে ডলির গর্ভপাত হয়েছে।

নির্যাতিত ডলি বলেন, তলপেটে লাথি দিয়ে সন্তান নষ্ট করেছে ওরা। ডলিকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। পুলিশের সহযোগিতা না পেয়ে ৩ জুন ডলির স্বামী শেরপুর আদালতে আবেদন করেন। আদালত পিবিআইকে ১০ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেন।

ডলির স্বামী মো. শফিউল্লাহ অভিযোগ করেন, জমিসংক্রান্ত বিরোধের জেরে তার ভাই-ভাবীরাসহ তাদের ভাড়াটে লোকজন নির্যাতন করে তার স্ত্রীর গর্ভের সন্তান নষ্ট করেছেন।

শফিউল্লাহ বলেন, পুলিশ ভিডিও গুম করেছিল। নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মামলা নেয় পুলিশ। ৯ আসামির মধ্যে লাকী নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

শফিউল্লাহর বড় ভাই নেছার উদ্দিন ডলিকে গাছের সঙ্গে বাঁধার কথা স্বীকার করেন। তবে ডলিকে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, শফিউল্লাহ ও ডলি তাঁদের সামাজিকভাবে হেয় করার জন্য এ ধরনের অভিযোগ করেছেন।

নকলা থানার ওসি কাজী শাহনেওয়াজ বলেন, জমি নিয়ে ভাইদের মধ্যে বিরোধ ও দাঙ্গা-হাঙ্গামার আশঙ্কার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠিয়ে দুপক্ষকে শান্ত করা হয়েছিল। তবে ঘটনার দিন গৃহবধূকে নির্যাতনের বিষয়ে কেউ অভিযোগ করেনি। তবে বুধবার ডলি খানম থানায় মামলা করেছেন। ইতিমধ্যে এজাহারভুক্ত আসামি লাকি আক্তারের বড়বোন নাসিমা আক্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে।

নির্যাতনের শিকার নারীকে সব ধরণের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।

দ্য ওয়ার্ল্ডবিডি/ঢাকা/কেএ

Share On