জাতীয়

উদ্দেশ্য ছিল মোবাইল ফোন চুরি, চিনে ফেলায় খুন

ছাদ থেকে দড়ি বেয়ে দোতলার ভেন্টিলেটর দিয়ে ঘরে ঢুকেছিল পারভেজ। পরে ঘরের ভেতর খাটের নিচে লুকিয়ে ছিল সে। সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর নিচতলায় রান্নাঘর থেকে বঁটি হাতে নিয়ে ফের দোতলায় ওঠে। ওই সময় স্মৃতি ফাতেমা টের পেয়ে তাকে দেখে চিনে ফেলেন। এতে স্মৃতি ফাতেমাকে সে এলোপাতাড়ি কোপায়। তা টের পেয়েছিলেন স্মৃতি ফাতেমার বড় মেয়ে সাবরিনা সুলতানা নোরা। পরে নোরাকেও কোপায়। নোরার চিৎকারে জেগে ওঠে তাঁর বাক্প্রতিবন্ধী ছোট ভাই সাদিল, তাকেও নৃশংসভাবে কুপিয়ে জবাই করে খাটের নিচে রেখে দেয়। এরপর এসব নারকীয় হত্যাযজ্ঞ টের পেয়ে জেগে ওঠে হাওয়ারিন। তাকেও কোপায় পারভেজ। পরে রক্তাক্ত নিস্তেজ অবস্থায় নোরা ও হাওয়ারিনকে ধর্ষণ করে। এরপর একে একে চারজনকেই গলা কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করে পারভেজ।

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার তেলিহাটী ইউনিয়নের আবদার এলাকার দোতলা একটি বাড়ি থেকে মা ও তাঁর তিন সন্তানের মরদেহ উদ্ধারের চার দিন পর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) হাতে ধরা পড়ে পারভেজ (১৮)। পারভেজ ওই এলাকার কাজিম উদ্দিনের ছেলে। কাজিম উদ্দিন পেশায় একজন রিকশাচালক।

গ্রেপ্তারের পর এই চার হত্যার ঘটনা স্বীকার করে সে। আর স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে গত রবিবার শেষ রাতে পিবিআইয়ের সদস্যরা রক্তমাখা কাপড়, লুণ্ঠিত স্বর্ণালঙ্কার ও দুটি মোবাইল ফোনসেট উদ্ধার করে।

গতকাল বিকেলে গাজীপুর জেলা পিবিআইয়ের কার্যালয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাসির আহমেদ সংবাদ সম্মেলনে ওই সব তথ্য জানান। পারভেজ গতকাল সোমবার বিকেলে গাজীপুর আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

গাজীপুর জেলা পিবিআইয়ের পরিদর্শক হাফিজুর রহমান জানান, ওই চার হত্যাকাণ্ডের পর ছায়াতদন্তে নামে পিবিআই। গোপন সূত্রের ভিত্তিতে গত রবিবার ওই এলাকা থেকেই পারভেজকে আটক করে তারা।

আটকের পর তাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পারভেজ ঘটনা স্বীকার করে। তবে সে (পারভেজ) দাবি করে, স্মৃতি ফাতেমা ও নোরার মোবাইল ফোনসেট চুরির উদ্দেশ্য ছিল তার। কিন্তু টের পেয়ে তাকে দেখে চিনে ফেলায় প্রথমে স্মৃতি ফাতেমা, পরে নোরা ও সাদিল এরপর হাওয়ারিনকেও হত্যা করে সে। পরে স্মৃতি ফাতেমা ও হাওয়ারিনের গলার সোনার চেইন, কানের দুল, নাকফুল, এবং রিং খুলে নেয়। এরপর আলমারি খুলে আরো দুটি সোনার চেইন, একটি আংটি, লাল রঙের ছোট একটি ডায়েরি ও স্মৃতি ফাতেমা এবং নোরার ব্যবহূত মোবাইল ফোনসেট লুট করে। আর সব কিছুই করে সে ঠাণ্ডা মাথায়। পরে হাত-মুখ ধুয়ে পেছনের গেট খুলে তার বাড়ি চলে যায়।

পিবিআইয়ের পরিদর্শক হাফিজুর রহমান আরো জানান, গতকাল বিকেলে আদালত পারভেজের জবানবন্দি গ্রহণ করে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

কে এই পারভেজ : পারভেজ এক ভয়ংকর খুনির নাম! বিগত ২০১৮ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সাত বছর বয়সী এক শিশুকে তুলে নিয়ে ধর্ষণের পর হত্যা করে সে। ওই ঘটনায় গ্রেপ্তার হলেও বয়স বিবেচনায় গত প্রায় ৯ মাস আগে উচ্চ আদালত থেকে জামিন পায় সে। জামিনে বেরিয়ে নিহত ওই শিশুর মা-বাবাকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য হুমকি দেয়। মামলা তুলে না নিলে তাঁদেরও দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেবে বলে ঘোষণা দেয়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, পারভেজের বাবা কাজিম উদ্দিন পেশায় একজন রিকশাচালক। তার মা দীর্ঘদিন ধরে সৌদিতে। তিন ভাই-বোনের মধ্যে পারভেজ মেজো। বড় বোনের বিয়ে হয়েছে কয়েক বছর আগে। ছোট ভাই পাশের মোসলেহ উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। তবে পারভেজ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোনোর তথ্য পাওয়া যায়নি। কৈশোর থেকেই মাদকাসক্ত পারভেজের বাবা কাজিম উদ্দিনও মাদকাসক্ত।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button