মানব পাচারের অভিযোগ স্থানীয় সাংসদের বিরুদ্ধে

লক্ষ্মীপুর জেলা প্রতিনিধিঃ   কুয়েতে মানবপাচারে হাজার কোটি টাকার কারবারের অভিযোগ উঠেছে লক্ষ্মীপুর-২ রায়পুর আসনের সংসদ সদস্য কাজী শহিদ ইসলাম পাপুলের বিরুদ্ধে। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ নিয়ে সংবাদের পর এলাকায় শুরু হয়েছে তোলপাড়।

সাংসদের বিরুদ্ধে এমন খবরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন দলীয় নেতাকর্মীরা। তবে কাজী শহীদ ইসলাম পাপুল  অভিযোগের বিষয়টি অস্বীকার করে বলছেন, কুয়েত সরকার ও ব্যবসায়ীদের ষড়যন্ত্রের শিকার তিনি।

স্থানীয় এলাকাবাসী ও দলীয় নেতাকর্মীরা জানান, কাজী শহীদ ইসলাম পাপুল গত ৩০ বছর ধরে কুয়েতে ব্যবসা করছেন। মারাতিয়া কুয়েতি গ্রুপ অব কোম্পানিজের স্বত্বাধিকারী তিনি। একাদশ জাতীয় নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর-২ রায়পুর আসনে ১৪ দলীয় জোট ও জাতীয় পার্টির সমঝোতার মাধ্যমে মনোনয়ন পেয়েছিলেন জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোহাম্মদ নোমান। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছিলেন পাপুলসহ আরও অনেকে। দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে আপেল প্রতীক নিয়ে তিনি স্বতন্ত্র নির্বাচন করেন। পরে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোহাম্মদ নোমান। তখন বিপুল আলোচনা ছিল যে, মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে পাপুল ১৪ দলীয় প্রার্থী নোমানকে নির্বাচন থেকে সরিয়ে দেন।

কাজী শহীদ ইসলাম পাপলুর স্ত্রী কাজী সেলিনা ইসলামও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

পাপুলের বিরুদ্ধে মানব পাচারের খবর জেলাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার পর সমালোচনার ঝড় ওঠে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। অনেকে এই সাংসদকে গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি জানিয়ে বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য করছেন।

সম্প্রতি কুয়েতের সিআইডির বরাত দিয়ে বাংলাদেশ থেকে মানবপাচার নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে দেশটির পত্রিকা আল কাবাস ও আরব টাইমস। কুয়েতি গণমাধ্যম ওই সাংসদের নাম উল্লেখ না করলেও দেশের একটি গণমাধ্যমের খবরে লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য কাজী শহীদ ইসলাম পাপলুর নাম এসেছে। স্বতন্ত্র এই সাংসদসহ তিনজনের চক্রটি অন্তত ২০ হাজার বাংলাদেশিকে কুয়েতে পাঠিয়ে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা আয় করেছে বলে কুয়েতের সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়।

ওই দেশটির ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট সিআইডির অভিযানের মুখে কুয়েত ছেড়েছেন পাপুল। মানবপাচারকারী সিন্ডিকেটগুলোর বিরুদ্ধে কুয়েত সরকার সম্প্রতি সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে। অভিযান নিয়ে কুয়েতের সংবাদ মাধ্যমগুলো সিরিজ রিপোর্ট করছে। সেখানে ওই এমপি ছাড়াও আরও দুজনের নাম এসেছে।

তাদের বিরুদ্ধে ১ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকার কারবারে রয়েছে অর্থপাচার, মানবপাচার ও ভিসা জালিয়াতির অভিযোগ। তদন্ত শুরু করেছে কুয়েতের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। একই অভিযোগে এক বাংলাদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে গ্রেপ্তার করে কুয়েতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তিনজন নিয়ে গঠিত চক্রের অন্য দুই সদস্য কুয়েত ছেড়ে পালিয়েছেন।

তাদের বিরুদ্ধে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে গৃহকর্মী হিসেবে ২০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি শ্রমিককে কুয়েতে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। শ্রমিকদের কুয়েতে পাঠানোর বিনিময়ে ৫ কোটি কুয়েতি দিনার বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকার বেশি নেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করা হয় প্রতিবেদনে।

পাপুলের বিষয়ে রায়পুর পৌর আওয়ামী লীগের যুগ্ম-আহ্বায়ক  ও ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আইনুল কবির মনির বলেন, গত জাতীয় নির্বাচনে ১৪ দলীয় জোটের প্রার্থী ছিলেন জাতীয় পার্টির মো. নোমান। পরে কী কারণে তিনি নির্বাচন থেকে সরে গেলেন সেটা কেউ নিশ্চিত নয়। এরপর স্বতন্ত্র প্রার্থী পাপুলের পক্ষে দলীয় নেতাকর্মীরা কাজ করে তাকে বিজয়ী করেন। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে মানবপাচারের অভিযোগে নেতকর্মীরা বিব্রত। যেহেতু তিনি সংসদ সদস্য, তাই প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করেবন বলে আশা করি।’

এদিকে স্থানীয় নেতাকর্মীরা জানান, কাজী শহীদ ইসলাম পাপুল এলাকায় দানবীর হিসেবে পরিচিত। মানবপাচারের খবরে বিব্রত স্থানীয় লোকজন। তাদের দাবি, বিষয়টি তদন্ত করে সঠিক তথ্য যেন বের করা হয়।

রায়পুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও সাবেক উপজেলা পরিষদের ভাইস-চেয়ারমান মো. শাহজাহান বলেন, ‘পাপুলের মূল ব্যবসা কুয়েতে মানবপাচার করা। তিনি হাজার হাজার মানুষ কুয়েতে নিয়েছেন। এলাকায় দু-হাতে টাকা বিলি করেন তিনি। তার টাকা পকেটে যায়নি এমন মানুষ পাওয়া যাবে না। তিনি বড় দানবীর হিসেবে এলাকায় পরিচিত। ’

পাপুলকে ভালো মানুষ হিসেবে উল্লেখ করে এমপির ঘনিষ্ঠ এই আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, ‘তারপরও তার বিরুদ্ধে যে মানবপাচারের অভিযোগ উঠেছে, সেটি দ্রুত তদন্ত করে সঠিক তথ্য উদঘাটন করার দাবি জানাই।’

নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন লক্ষ্মীপুর-২ রায়পুর আসনের সংসদ সদস্য কাজী শহীদ ইসলাম পাপুল। তিনি দাবি করছেন, কুয়েত সরকার ও ব্যবসায়ীদের ষড়যন্ত্রের শিকার তিনি। তিনি কুয়েত থেকে পালিয়ে দেশে আসেননি। সব সময় আসা-যাওয়ার মধ্যে রয়েছেন। কোনোভাবে মানবপাচারের সঙ্গে তিনি জড়িত নন বলে দাবী করেন এ সংসদ সদস্য।

পাপুলের উত্থান সম্পর্কে জানা যায়, প্রথম জীবনে পাপুল কুয়েতের একটি শীর্ষ প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করেন। পরে নিজেই প্রতিষ্ঠানটির একজন অংশীদার হয়ে ওঠেন। এরপর আর তার পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। নিজের মতো করে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করতে শুরু করেন।

প্রতিবেদনের ইঙ্গিত অনুযায়ী, পাপুল প্রায়ই কুয়েতে যাতায়াত করেন। তবে সেখানে কখনোই ৪৮ ঘণ্টার বেশি অবস্থান করতেন না তিনি।  এক সপ্তাহ আগে সিআইডির তদন্ত শুরু হওয়ার তথ্য জানার পর তিনি কুয়েত ছাড়েন। তার প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম স্থগিত করে কর্মীদের পাঁচ মাসের বেশি সময় ধরে কোনো বেতন দেয়া হচ্ছে না।

কুয়েতের সংবাদমাধ্যম আল-কাবাসের প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ওই এমপি সাম্প্রতিক সময়ে কুয়েতে একজন মার্কিন বাসিন্দার সঙ্গে আর্থিক অংশীদারি গড়ে তোলেন। কুয়েতে আয় করা বেশির ভাগ অর্থ তিনি আমেরিকা পাঠিয়ে দিয়েছেন।

Share On