নাটক-সিনেমায় ঘুরেফেরে সেই একই মুখ

বিনোদুনিয়া প্রতিবেদক

আবারও এলো ঈদ। বরাবরের মতোই নানা আয়োজনে হাজির হচ্ছে টিভি চ্যানেলগুলো। পাশাপাশি প্রস্তুতি চলছে নতুন চলচ্চিত্র মুক্তিরও। সঙ্গীত ভুবনেও আসছে নতুন নতুন গান। টিভিতে প্রচার হওয়া প্রমো, চলচ্চিত্রের ট্রেলার আর গানের সংবাদ দেখে মনে হচ্ছে, সেই একই ধারাবাহিকতা। নেই কোনো পরিবর্তন। ঘুরেফিরে আবার সেই একই মুখ।

চলচ্চিত্র
ঈদ উৎসবে চলচ্চিত্র মুক্তি দেওয়ার জন্য প্রযোজক-পরিচালকরা এক প্রকার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন। নায়ক-নায়িকারা থাকেন মুখিয়ে। ঈদে চলচ্চিত্র মুক্তি মানেই মুনাফার হাতছানি ও আলোচনার খোরাক। এমনিতে প্রতি ঈদেই একাধিক ছবি মুক্তি পায়।

কিন্তু এবারের ঈদে এখন পর্যন্ত দুটি ছবি মুক্তির কথা শোনা যাচ্ছে। এগুলো হলো- জাকির হোসেন রাজু পরিচালিত শাকিব-বুবলীর ‘মনের মতো মানুষ পাইলাম না’ ও রাজা চন্দের পরিচালনায় রোশান-ববির ‘বেপরোয়া’।

‘মনের মতো মানুষ পাইলাম না’ ছবির প্রধান নায়ক শাকিব খান। অনেক বছর পর পরিচালক জাকির হোসেন রাজুর সঙ্গে কাজ করলেন তিনি। শাকিব বলেন, ‘আমি শুধু এটুকুই বলব, ছবিটি ব্যবসায়িকভাবে সফলতা পাওয়ার পাশাপাশি সম্মানও বয়ে আনবে।’

এই ছবির মধ্য দিয়ে পরিচালক জাকির হোসেন রাজুর সঙ্গে প্রথম কাজ করলেন বুবলী। গত কয়েক বছর ধরে ঈদের ছবি মানেই শাকিব-বুবলী জুটির ছবি। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

বুবলী বলেন, ‘ঈদ আয়োজনে ছবি মুক্তি পেলে অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করে। শাকিব আর আমাকে দর্শক গ্রহণ করেছেন বলেই বড় এই উৎসবে আমাদের ছবি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়।’

শাকিব-বুবলী জুটির ‘মনের মতো মানুষ পাইলাম না’-এর সঙ্গে মুক্তি পাচ্ছে ববি-রোশন জুটির ‘বেপরোয়া’ সিনেমাটি। কয়েকবার মুক্তির তারিখ পেছানোর পর অবশেষে এবার ছবিটি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান জাজ মাল্টিমিডিয়া।

প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আলিমুল্লাহ খোকন বলেন, ‘অন্য প্রযোজকদের প্রতি ভালোবাসা দেখাতে গিয়েই এমনটা করতে হয়েছে। চ্যালেঞ্জ করে বলতে চাই, গত এক বছরে এ ধরনের কোনো ছবি দেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়নি।’ ঈদের মতো বড় উৎসবে ‘বেপরোয়া’ মুক্তি পাবে বলে উচ্ছ্বসিত চিত্রনায়ক রোশান।

তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান হচ্ছে।’ শাকিব খানের সঙ্গে একই সময়ে ছবি মুক্তি পাওয়াকে চ্যালেঞ্জ মনে করে তিনি বলেন, ‘দর্শক যদি প্রেক্ষাগৃহে যান, আমার ছবিটি পছন্দ করবেন।’ এদিকে ‘বন্ধন’ ছবিটি ঈদে মুক্তি দেবেন কিনা, এই নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছেন পরিচালক অনন্য মামুন। অন্যদিকে রাজু আলীমের ‘ভালোবাসার রাজকন্যা’ সিনেমাটি ঈদে টেলিভিশনে মুক্তি পাবে।

নাটক-টেলিছবি
বছরব্যাপী টিভি চ্যানেলগুলোয় অসংখ্য নাটক-টেলিছবি প্রচার হলেও ঈদ ঘিরে বিশেষ পরিকল্পনা থাকে নির্মাতা ও অভিনয়শিল্পীদের। নির্মাতাদের মধ্যে থাকে তারকাশিল্পীদের নিয়ে কাজ করার প্রতিযোগিতা। গত কয়েকবছরের ন্যায় এবারের ঈদের নাটক-টেলিছবিতেও দেখা যাবে সেই পরিচিত মুখগুলোকেই।

তাদের মধ্যে আছেন মোশাররফ করিম, নুসরাত ইমরোজ তিশা, অপূর্ব, আফরান নিশো, মেহজাবিন চৌধুরী, তানজিন তিশা, তৌসিফ মাহবুব, সাফা কবির প্রমুখ। এবারের ঈদেও আফরান নিশোকে দর্শক নানা চরিত্রে একাধিক নাটক ও টেলিছবিতে দেখতে পাবেন।

এ প্রসঙ্গে নিশো বলেন, ‘প্রতিটি উৎসব ঘিরে দর্শক-শ্রোতার এক ধরনের প্রত্যাশা থাকে। তারা চান এমন আয়োজন, যা আনন্দ দেওয়ার পাশাপাশি যাপিত জীবন নিয়ে কিছুটা ভাবাবে। এ জন্য আমি সব সময় নিজেকে ভিন্ন ভিন্ন গল্প ও চরিত্রে উপস্থাপন করতে চাই। এবার ঈদে এমন কিছু কাজ করেছি, যা দর্শকের মনে ছাপ ফেলবে বলে আমার ধারণা।’

নিশোর মতো মেহজাবিনও ঈদের নানা ধরনের গল্পে ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন। নাটকের সংখ্যা বাড়লেও চরিত্র নির্বাচনে বরাবরই খুতখুতে স্বভাবের মেহজাবিন। তার কথায়, ‘এমন কিছু কাজ করতে চাই, যা দর্শক অনেক দিন মনে রাখবেন। এ কথা অবশ্য বাড়িয়ে বলা নয়।’

সঙ্গীত ভুবন
গানের সময়টা খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। গত কয়েক বছর ইউটিউব ভিউ ভিউ নিয়ে অনেক মাতামাতি হয়েছে। আর এ বছর এসে কোনো গানেরই উল্লেখযোগ্য ভিউ চোখেই পড়ছে না। বিশেষ করে তরুণ কিছু শিল্পীর গান প্রকাশ হওয়ার পরপরই কোটি ভিউ ছাড়িয়ে যেত। এই উত্তেজনা বর্তমানে আর নেই। অনেকে হতাশার কথা বললেও সংগীতাঙ্গনে এসেছিল নতুন বেশ কয়েকজন শিল্পী।

নতুন শিল্পীরা নতুন নতুন গান উপহার দেবে আর সেগুলো শ্রোতার হৃদয়ে দাগ কেটে যাবে। এই প্রত্যাশা থাকলেও অল্প দিনেই নতুন শিল্পীর অনেকেই হোঁচট খেয়েছেন। বলা যায়, তাদের পায়ের নিচে মাটি শক্ত করার আগেই হয়েছে নড়বড়ে। এ বছর শত শত গান প্রকাশ হলেও কোনো গানেরই তেমন আওয়াজ নেই।

প্রথমত, বিশ্বকাপ ক্রিকেট উপলক্ষে সংগীতাঙ্গনে প্রভাব পড়ার কথা বলা হলেও ক্রিকেট চলে গেছে অনেক দিন হলো। এই অজুহাত আর দেওয়া যায় না। মানুষের গান শোনার সময় তো থেমে নেই। মানুষ গান শুনছে, শুনবেই। তাহলে কি নতুন গান শুনছেন না?

এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে গত ঈদে প্রকাশিত শত শত গানের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। নতুন গান যদি শুনত তাহলে কোনো না কোনো গান আপনার, আমার কানে বাজত। কোনো গানের কথা সুর হৃদয় ছুঁয়ে যেত। গত ঈদে প্রকাশিত কোনো গানই এখন পর্যন্ত শ্রোতাদের মাঝে ছড়িয়ে পড়েনি।

তাহলে কি সংগীতাঙ্গনে আসা নতুন মুখরা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না? ভরসার নাম কেবলই আসিফ আকবর, হাবিব ওয়াহিদ, এফএ সুমন, ইমরান, মিনার, তাহসান, কনা, বেলাল খান, কাজী শুভসহ কয়েকজন সেই চেনা মুখ।

এদিকে নিয়মিত গান প্রকাশ করছেন গুটি কয়েক সংগীত তারকা। এর সংখ্যা হয়তো আরও কিছু যোগ হবে এই আর কি। আসছে কোরবানির ঈদ। এই ঈদেও প্রকাশ হবে শতাধিক গান। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো গান ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আচ্ছা, এই যে শত শত গান প্রকাশ হচ্ছে এটি কিভাবে? কার পয়সায় গানগুলো তৈরি হচ্ছে?

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সংগীতাঙ্গনে আসা নতুন শিল্পীরাই গান তৈরি থেকে শুরু করে মিউজিক ভিডিও পর্যন্ত নির্মাণ করে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানকে ‘উপহার’ দিচ্ছেন। এই হিসেবে গান প্রকাশ হচ্ছে শত শত। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের ইনভেস্ট করা গানের সংখ্যা যৎসামান্য। কেন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গানের পেছনে ইনভেস্ট করছেন না, ধীরে ধীরে গান প্রকাশ থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন?

এর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে অনেকেই দেখছেন, নাটক প্রযোজনা। গানের চেয়ে নাটকে ইনভেস্ট করাতেই লাভজনক হিসেবে দেখছেন বেশি। নাটকের লেন্থ অনুযায়ী ইউটিউব থেকে বিজ্ঞাপন পাওয়া যায় বেশি। তাছাড়া গানের পেছনে ইনভেস্ট করার চেয়ে নাটকে ইনভেস্ট করলে নাটকের সঙ্গে গান পাচ্ছেন ‘ফ্রি’। ফ্রি বলতে এক ঢিলে দুই পাখি মারার মতো ব্যাপার। নাটকও কিনছেন, নাটকে গানও থাকছে। আবার সেই গান পরবর্তীতে আলাদা করে গানের চ্যানেলে প্রকাশ করছেন। লাভেই লাভ!

প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান নিজেদের অর্থায়নে যখন গান প্রকাশ কমিয়ে দিচ্ছেন ঠিক সেই মুহূর্তে অনেক শিল্পীও নিজেদের ইউটিউব চ্যানেল গুছিয়ে নিচ্ছেন। শিল্পীরা তাদের নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশ করছেন গান। এতে করে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের পেছনে ঘুরতে হয় না। নিজের হিসেব নিজেরই থাকে। নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলে গান প্রকাশ করছেন আসিফ আকবর, হাবিব ওয়াহিদ, ইমরান, বেলাল খান, লিজা, মাহতিম সাকিবসহ আরও অনেকে।

গানের ভবিষ্যৎ তাহলে কোন দিকে যাচ্ছে? সব কথার শেষ কথা, গান যদি ভালো হয় তাহলে শ্রোতার কানে ঠিকই পৌঁছাবে। সেটি হোক প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান কিংবা শিল্পীর ব্যক্তিগত চ্যানেলে। গান কোথায় প্রকাশ হলো কার চ্যানেলে প্রকাশ হলো সেটি বড় কথা নয়, শ্রোতারা চায় সুন্দর কথা, সুর সংগীতের গান। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলোরও উচিত ভালো শিল্পীর পেছনে লগ্নি করে ইন্ডাস্ট্রির চাকা সচল রাখা। শ্রোতাদের ভালো গান উপহার দিতে পারলেই বেঁচে থাকবে গানের মানুষরা।

দ্য ওয়ার্ল্ডবিডি/ঢাকা/এফওয়াই

Share On