বিদেশিদের ‘পার্সেল’ ফাঁদে নিঃস্ব অনেকে

নিজস্ব প্রতিবেদক

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন সাজ্জাদ হোসেন। একদিন তার ফেসবুকে স্যাম রিমঝিম নামে এক নারীর ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট আসে। সেটি একসেপ্ট করেন সাজ্জাদ। কয়েক দিন ফেসবুক মেসেঞ্জারে কথা হয় তাদের। এভাবেই তাদের চ্যাটিং চলতে থাকে। একপর্যায়ে দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব তৈরি হয়।

একদিন স্যাম রিমঝিম জানান, তিনি ইন্দোনেশিয়ান। থাকেন ইংল্যান্ডে। সেখানে এক বাংলাদেশি নাগরিককে তিনি বিয়ে করেছিলেন। তিনি মারা গেছেন। তার মৃত্যুর পর ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি থেকে বেশ কিছু টাকা পেয়েছেন তিনি। কিছু টাকা ইন্দোনেশিয়ান অসহায় মানুষের জন্য ব্যয় করেছেন।

বাকি টাকা বাংলাদেশের অসহায় মানুষের জন্য পাঠাতে চান। কিন্তু কোনো মাধ্যম পাচ্ছেন না। তাই সাজ্জাদকে হেল্প করার অনুরোধ করেন। তার পাঠানো টাকা থেকে ৩০ শতাংশ সাজ্জাদ নিজে ব্যয় করতে পারবেন। প্রায় দেড় কোটি টাকার লোভ স্বল্প আয়ের সাজ্জাদকে পেয়ে বসে। সাজ্জাদের এনআইডি কার্ডের কপি ও বাসার ঠিকানা জানতে চান স্যাম রিমঝিম।

কয়েক দিন পর সাজ্জাদকে জানান, তার নামে কানাডা থেকে একটি পার্সেল পাঠানো হয়েছে। যার ওজন ২৫ কেজির মতো। একজন ব্রিটিশ ডেলিগেট সেটি সাজ্জাদের বাসায় পৌঁছে দেবেন। কিন্তু ডলারের বিষয়টি ঘোষণা দেওয়া হয়নি। তাই হয়তো বাংলাদেশি কাস্টমসে কিছু টাকা খরচ হবে। পরদিন এক বাঙালি নিজেকে কাস্টমস কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে ফোন দেন সাজ্জাদকে।

সেই কাস্টম কর্মকর্তা বলেন, আপনার নামে একটি পার্সেল এসেছে। সঙ্গে একজন বিদেশি ডেলিগেট আছেন। আপনার বাসায় সেটি পৌঁছে দেওয়া হবে। কিন্তু আপনাকে এক লাখ ৪০ হাজার টাকা কাস্টমস ট্যাক্স পরিশোধ করতে হবে। কিছুক্ষণের মধ্যে কোটি টাকা চলে আসছে তার হাতে। তাই স্ত্রীর গয়না বিক্রি করে ও নিজের জমানো কিছু টাকা নিয়ে বিদেশি ডেলিগেটের অপেক্ষায় থাকেন সাজ্জাদ।

সেদিন বিকাল বেলা সংশ্লিষ্ট কাস্টমস কর্মকর্তা ও এক নাইজেরিয়ান আসেন তার বাসায়। বুঝিয়ে দেওয়া হয় পার্সেলটি। তবে সেটি তারা থাকা অবস্থায় খুলতে নিষেধ করা হয়। কাস্টমস ট্যাক্সের খরচ বাবদ এক লাখ ৪০ হাজার টাকা নিয়ে চলে যান তারা।

পার্সেল পেয়ে এবার মহাখুশি সাজ্জাদ। কোটিপতি বনে যাচ্ছেন। পার্সেলটি খুলে তো মাথায় হাত। পুরনো কিছু কাপড়-চোপড় আর ইট-পাথর দিয়ে ভরা। একটি ডলারও নেই সেটির ভেতর। দৌড়ে বাসার নিচে নেমে খুঁজতে থাকেন সেই বিদেশিকে। কিন্তু তাদের টিকিটিও খুঁজে পান না। বুঝতে পারেন তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন।

সাজ্জাদের মতো আরেক প্রতারণার শিকার কাফরুলের তাহমিনা পারভীন। একজন স্কুলশিক্ষিকা তিনি। তাহমিনার ফেসবুক আইডিতে উইলিয়াম ডেভিড নামের একজন ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠায়। সেই রিকোয়েস্টটি গ্রহণ করেন তাহমিনা। তখন মেসেঞ্জারের মাধ্যমে তাদের মধ্যে কথাবার্তা শুরু হয়। একসময় উইলিয়াম ডেভিড তাহমিনার কাছে তার হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার চায়। পরে দুজনের হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে নিয়মিত কথাবার্তা চলত।

কিছুদিন যাওয়ার পর উইলিয়াম উপহার পাঠানোর জন্য তাহমিনার কাছে তার বাসার ঠিকানা চায়। পরে তিনি তার বাসার ঠিকানা দেন। কয়েক দিন পর ব্যবহূত মোবাইল নম্বরে বেন কার্লোস নামের এক ব্যক্তি ফোন দিয়ে বলেন, তিনি ডেল্টা কুরিয়ার সার্ভিসে চাকরি করেন। উইলিয়াম ডেভিড নামের এক ব্যক্তি ইংল্যান্ড থেকে একটি পার্সেল পাঠিয়েছেন।

সেই পার্সেলটি পাওয়ার জন্য বিমানবন্দরের কাস্টমস অথরিটি ৪৫ হাজার টাকা দাবি করছেন। টাকা পরিশোধ করলেই সেই পার্সেলটি পাওয়া যাবে। এ জন্য বেন কার্লোস মো. সালাহ উদ্দিনের নামে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের কারওয়ানবাজার ব্রাঞ্চের একটি ব্যাংক হিসাব দেন।

তাহমিনা একই ব্যাংকের ডাচ্-বাংলা শাখা থেকে ওই হিসাবে ৪৫ হাজার টাকা পাঠিয়ে দেন। টাকা পেয়ে কার্লোস তখন উপহারটি দিচ্ছি-দেব বলে সময় নেন। এর কিছুদিন পরে কার্লোস আবার তাহমিনাকে ফোন করে বলেন, ওই উপহারের প্যাকেটের ভেতরে পাউন্ড আছে যা কাস্টমসের এক সিনিয়র কর্মকর্তার নজরে এসেছে। ক্লিয়ার করতে আরো ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা দিতে হবে। এত টাকা পাঠানোর জন্য সময় চাইলে কার্লোস তখন মানি লন্ডারিং আইনে মামলা হওয়ার ভয়ভীতি দেখান।

মামলার ভয়ে তাহমিনা আবার মো. একরাম মুনশি নামের আরেক ব্যক্তির ডাচ্-বাংলা ব্যাংক হিসাবে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা পাঠিয়ে দেন। কার্লোস তখন তাহমিনাকে জানায় সময়মতো উপহারটি পেয়ে যাবেন। পরদিন আবার কার্লোস তাকে ফোন করে জানান উপহারের প্যাকেটের ভেতরে বাংলাদেশি টাকায় ১ কোটি ৭ লাখ ৭৭ হাজার ৪৮০ টাকা থাকায় শতকরা ৩ শতাংশ হারে ৩ লাখ ২৩ হাজার ৩২০ টাকা ট্যাক্স জমা দিতে হবে।

বারবার কেন এত টাকার জটিলতা, ওই সময় তাহমিনা কার্লোসের সঙ্গে দেখা করতে চাইলে তিনি ব্যস্ততায় রাজি হননি। তখন তাহমিনার আর বোঝার বাকি থাকে না তিনি বিশাল এক ফাঁদে পা দিয়েছেন।

বিষয়টি জানান, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) এক কর্মকর্তাকে। পরে তার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পিবিআই নাইজেরিয়ান হেনরি ইশিকা ও মো. ইসমাইল হোসেন নামে এক বাংলাদেশি নাগরিককে আটক করে। এরপরই বেরিয়ে আসে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য।

পিবিআইয়ের বিশেষ পুলিশ সুপার আবুল কালাম আজাদ জানান, প্রতারক ডেভিড ওরফে হেনরি ইশিকা নাইজেরিয়ান খেলোয়াড় হিসেবেই পরিচিত। বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্লাবের হয়ে ফুটবলও খেলেন। খেলাধুলার পাশাপাশি করেন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড।

কয়েক বছর আগে এমন অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে জেলহাজতেও যান। সেখানেই সখ্য গড়ে তোলেন বাংলাদেশি নাগরিক মো. ইসমাইল হোসেনের (৪৮) সঙ্গে। কিছুদিন পর দুজনেই জামিনে বের হয়ে আসেন।

প্ল্যান করে পুনরায় জড়িয়ে পড়েন এমন ভয়ংকর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে। তবে এবার অপরাধের ধরন পরিবর্তন করেন তিনি। সহজ-সরল নারীদের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে ফাঁদ পাতেন। তারপর তাহমিনাদের কাছ থেকে বিভিন্ন কৌশলে হাতিয়ে নেন কোটি কোটি টাকা।

পিবিআই কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, রাজধানীতে বেশ কিছু নাইজেরিয়ান আছেন, তারা বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের সঙ্গে প্রতারণার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও তারা দেশে ফিরে যাচ্ছে না। তাদের সঙ্গে কিছু বাংলাদেশি অপরাধীও জড়িয়ে পড়ছে।

নিজে আর্থিকভাবে লাভের আশায় তারা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সাপোর্ট ও বাড়ি ভাড়ার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে এসব বিদেশি অপরাধীদের। মূলত, এসব বিদেশির টার্গেট বয়স্ক মহিলা ও বয়সে তরুণ যুবক। একাধিকবার তাদের গ্রেপ্তার করা হলেও জামিনে ছাড়া পেয়ে ফের একই কাজ করে যাচ্ছে।

সাধারণ মানুষকে এ ধরনের প্রতারণার ফাঁদে পা না দেওয়ার আহ্বান জানান আবুল কালাম আজাদ। কেউ এ ধরনের প্রস্তাব দিলে সঙ্গে সঙ্গে তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর পরামর্শ দেন তিনি।

দ্য ওয়ার্ল্ডবিডি/ঢাকা/এফওয়াই

Share On