সমীকরণ না মিলিয়েই তদন্ত শেষ হচ্ছে!

নিজস্ব প্রতিবেদক

সমীকরণ না মিলিয়েই শেষ করা হচ্ছে দেশব্যাপী আলোচিত বরগুনার শাহনেওয়াজ রিফাত শরীফ হত্যা মামলার তদন্ত। এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। উল্টো তৈরি হয়েছে ধূম্রজাল। সেসবের মধ্যেই জেলা পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তদন্ত শেষ পর্যায়ে শিগগিরই চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দেওয়া হবে।

জানা গেছে, মামলায় সাক্ষী করা হয়নি হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী দুজনকে। যাদের সাক্ষী করা হয়েছে, তাদের মধ্যে রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি (এখন আসামি) ছাড়া কেউ ঘটনাস্থলে ছিল না। ঘটনার আগে দুই আসামির সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে মিন্নি দ্বিতীয় দফায় ফোনে রিফাতকে কলেজে ডেকে এনেছেন বলে পুলিশ যে দাবি করেছে, তার প্রমাণ পাননি বাদী।

মিন্নির সঙ্গে নয়নের কয়েকটি মোবাইল ফোনে কথা হতো বলে পুলিশ দাবি করলেও একটি মোবাইল ফোনও তাঁর (মিন্নির) নয় বলে জানা গেছে। কখন, কোথায় এই ফোনালাপ হলো সে ব্যাপারেও প্রশ্ন তুলেছে মিন্নির পরিবার। জানা গেছে, এসব ফোন নম্বর নয়ন ও তাঁর মায়ের নামে নিবন্ধন করা।

অন্যদিকে প্রথম যে ভিডিও ফুটেজটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, সেটি কার মোবাইল ফোন থেকে ধারণ করা এবং কে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়েছে, তা এখনো জানা যায়নি। মামলায় গুরুত্বপূর্ণ হলেও এসব প্রশ্নের জবাব না খুঁজে তড়িঘড়ি করে অভিযোগপত্র দাখিলের প্রক্রিয়া চালাচ্ছে পুলিশ।

অথচ মোবাইল ফোনে নয়নের সঙ্গে মিন্নির কথিত যোগাযোগের প্রমাণসহ ২০ ধরনের আলামত হাজির করে হত্যাকাণ্ডে মিন্নির সম্পৃক্ততা প্রমাণে পুলিশ ব্যস্ত বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র। কিন্তু হত্যাকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়া মুসা ওরফে মুসা বন্ডসহ এখনো এজাহারনামীয় চার আসামি পলাতক রয়েছে।

গত ২৬ জুন সকালে বরগুনা কলেজ এলাকায় শত শত মানুষের সামনে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তাঁকে কোপানোর ঘটনার একটি ডিভিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে দেশব্যাপী আলোচিত হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, রিফাতের স্ত্রী মিন্নি স্বামীকে বাঁচানোর প্রাণপণ চেষ্টা করে ব্যর্থ হন।

এ ঘটনায় রিফাতের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ ১২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরো চার-পাঁচজনকে আসামি করে একটি মামলা করেন। ওই মামলায় মিন্নিসহ ১০ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। তবে দুলাল শরীফ প্রায় দুই সপ্তাহ আগে ছেলের হত্যাকাণ্ডের জন্য পুত্রবধূকে দায়ী করে তাঁর গ্রেপ্তার দাবি করেন।

এরপর মিন্নিকে আসামি হিসেবে এ মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। মিন্নির বাবার অভিযোগ আসল অপরাধীদের আড়াল করতেই মিন্নিকে ফাঁসানো হচ্ছে। এর মধ্যে গত ২ জুলাই পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে মামলার ১ নম্বর আসামি সাব্বির আহমেদ নয়ন ওরফে নয়ন বন্ড নিহত হয়েছেন।

এদিকে মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর বলেন, প্রভাবিত হয়ে করা তদন্তে পরিকল্পিতভাবে মিন্নিকে গুরুত্বপূর্ণ আসামি বানানোর অপচেষ্টা চলছে। এখানে অনেক সাক্ষ্য-প্রমাণই সাজানো। এ কারণেই তাঁরা মামলার তদন্ত সংস্থার পরিবর্তন চান।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রিফাত হত্যা মামলায় এখন পর্যন্ত ১৫ জন আসামি গ্রেপ্তারের পর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এর মধ্যে এজাহারনামীয় সাতজন এবং সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার হওয়া আটজন রয়েছে।

এখনো পলাতক আছে মুসা বন্ড, মোহাইমানুল ইসলাম সিফাত, আবু আব্দুল্লাহ রায়হান ও রাকিবুল হাসান রিফাত হাওলাদার নামে এজাহারের চার আসামি। আসামিদের জবানবন্দির পাশাপাশি মোবাইল ফোনের কললিস্ট, ধারালো অস্ত্র, মোবাইল ফোনসেট, কল রেকর্ডসহ ২০ ধরনের আলামত পরীক্ষার জন্য জব্দ করা হয়েছে।

বরগুনার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন গত সপ্তাহে বলেন, ‘যার সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে, তাকেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সব আসামি আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে। মামলার তদন্ত এখন শেষ পর্যায়ে।’

মিন্নির আইনজীবী, জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল বারী আসলাম বলেন, ‘আসামির যতই জবানবন্দি থাকুক না কেন, প্রত্যক্ষ সাক্ষীর জবানবন্দি মামলায় গুরুত্বপূর্ণ। এটি আলোচিত মামলা, তাই এর তদন্তে সব প্রশ্নের উত্তর থাকা দরকার।’

দ্য ওয়ার্ল্ডবিডি/ঢাকা/এফওয়াই

Share On