স্কুল কক্ষের তালা ভেঙে রেনুকে গণপিটুনি

নিজস্ব প্রতিবেদক

চার-পাঁচ জন নারী অভিভাবক তাসলিমা বেগম রেনুকে ছেলেধরা বলে আখ্যা দেওয়ার পর নিরাপত্তার জন্য স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা শাহনাজ বেগম দোতালার একটি কক্ষে তাকে তালাবদ্ধ করে রাখেন। এরই মধ্যে নারী অভিভাবক আকলিমা স্কুলের সামনে গিয়ে চিৎকার করতে থাকেন যে স্কুলে ছেলেধরা আটক করা হয়েছে। এতে শত শত মানুষ জড়ো হয়ে স্কুলে প্রবেশ করে। হৃদয় ছেলেধরাকে খুঁজতে থাকে। স্কুলের দোতালার কক্ষে গিয়ে সেসহ ৭/৮ জন লোহার রড দিয়ে আঘাত করে তালা ভেঙ্গে ফেলে।

এরপর রেনুকে টেনে হিঁচড়ে দোতালা থেকে স্কুলের সামনের কমপাউন্ডে নিয়ে আসে। এরপর রেনুকে তারা পেটাতে থাকে। স্কুলের দোতালার বারান্দায় প্রধান শিক্ষিকা শাহনাজ বেগমসহ অন্য শিক্ষকগণ এই দৃশ্য দাঁড়িয়ে দেখছিলেন। স্কুলের শিক্ষকরা কোন বাধা দেয়নি। মঙ্গলবার (২৩ জুলাই) রাতে নারায়ণগঞ্জের ভুলতা থেকে হৃদয় ডিবি পুলিশের হাতে আটক হওয়ার পর জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য জানিয়েছে।

ঘটনার দিন স্কুল গেটে থাকা এক নারীর চিৎকারে তিনি গণপিটুনিতে অংশ নেন এবং ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের নামও বলেছেন। আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তার ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত।

বাড্ডা থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, ছেলেধরা চিৎকার করে মানুষ জড়ো করা ওই নারীকে আমরা শনাক্ত করেছি। তবে তিনি পুরো ঘটনা অস্বীকার করেছেন। তাকে আমরা নজরবন্দীর মধ্যে রেখেছি। তার বিরুদ্ধে আমরা অনুসন্ধান চালাচ্ছি। নিশ্চিত হয়েই তাকে গ্রেফতার করা হবে।

বুধবার (২৪ জুলাই) বিকালে মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা বাড্ডা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আব্দুর রাজ্জাক আসামিকে আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। ঢাকা মহানগর হাকিম মোহাম্মদ জসিম হৃদয়কে ৫ দিনের রিমান্ডের আদেশ দেন। রাষ্ট্রপক্ষ ও বাদীপক্ষে ছিলেন মাইদুল ইসলাম পলক, জাহিদুল ইসলামসহ আরও অনেকে। তবে আসামিপক্ষে কোনো আইনজীবী ছিল না।

বুধবার (২৪ জুলাই) ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে ডিবি’র অতিরিক্ত কমিশনার আব্দুল বাতেন বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হৃদয় জানিয়েছে, ঘটনার দিন রেনু স্কুলে প্রবেশ করার সময় গেটে থাকা অন্য এক নারী অভিভাবক তার পরিচয় এবং বাসার ঠিকানা জানতে চান।

এর পরিপ্রেক্ষিতে রেনু ওই নারীকে তার নাম-ঠিকানা জানান। সে সময় ওই নারী রেনুকে দেখিয়ে ছেলেধরা বলে চিৎকার করেন। এর মধ্যে রেনুকে স্কুলের একটি কক্ষে বন্দি করা হয়। ছেলেধরার খবরটি দ্রæত ছড়িয়ে পড়ে। যেহেতু কাছেই বাজার তাই মুহূর্তের মধ্যে শত শত মানুষ ভিড় জমায়।

এদের মধ্যে উৎসুক কিছু জনতা স্কুলের ভেতরে প্রবেশ করে রেনুকে বের করে পিটুনি দেয়। হৃদয়ও তাদের সঙ্গে অংশ নেয়। তিনি বলেন, হৃদয় স্কুলের পাশেই একটি দোকানে সবজি বিক্রি করতো। সবজি বিক্রি শেষে সে স্কুলের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। রেনুকে স্কুলে প্রবেশ করতেও দেখেছিল সে।

ডিবির এ কর্মকর্তা আরো বলেন, ঘটনার পর হৃদয় যখন বুঝতে পারে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করবে তখন নারায়ণগঞ্জে পালিয়ে যায়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রেনু এবং ওই নারী পূর্ব পরিচিত কিনা সেটি খতিয়ে দেখতে হবে। ঘটনাটি পরিকল্পিত কিনা তা ওই নারীকে জিজ্ঞাবাদের পর বলা যাবে। কারণ রেনুকে দেখে তিনিই প্রথম ‘ছেলেধরা’ বলে চিৎকার করেছিলেন।

তিনি আরও জানান, গ্রেপ্তার এড়াতে হৃদয় মাথা ন্যাড়া করেছিল। এছাড়া তার সব কাপড় পুড়িয়েও ফেলতে বলে তার নানীকে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে হত্যার স্বীকার করেছে। এছাড়া সেসহ যারা রেনুকে তালা ভেঙে করে আনে, তাদের নাম বলেছে। আমরা তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করবো।

উল্লেখ্য, গত ২০ জুলাই সকালে মেয়ে তুবাকে ভর্তি করার জন্য রাজধানীর উত্তরপূর্ব বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খোঁজখবর নিতে যান তাসলিমা বেগম রেনু। এ সময় তাকে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় ওইদিন রাতেই বাড্ডা থানায় অজ্ঞাত ৪০০-৫০০ জনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন নিহতের ভাগিনা নাসির উদ্দিন।

এ ঘটনার মূলহোতা হৃদয়সহ মোট ৭ জনকে গ্রেপ্তার করলো পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে জাফর নামে একজন গত সোমবার বিচারকের কাছে দোষ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।

হৃদয় পাঁচ দিনের রিমান্ডে

দ্য ওয়ার্ল্ডবিডি/ঢাকা/এফওয়াই

Share On