জাতীয়

নিম্নমানের হেলমেটে মৃত্যুঝুঁকি!

নিজস্ব প্রতিবেদক

মোটরবাইকে হেলমেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক। আগে অনীহা থাকলেও সম্প্রতি ট্রাফিক বিভাগের কড়াকড়িতে হেলমেটের ব্যবহার অনেক বেড়েছে। তবে তা যতটা মামলা এড়ানোর জন্য, ততটা নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য নয়।

কারণ, দেশে তৈরি এসব হেলমেটের বেশিরভাই মানসম্মত নয়। বুয়েটের এক গবেষণা বলছে, দেশে ব্যবহৃত হেলমেটের বেশিরভাগই দুর্ঘটনায় সুরক্ষা দেবে না। হেলমেটের মান পরীক্ষার দায়িত্ব বিএসটিআইর হলেও প্রতিষ্ঠানটির সেই সক্ষমতা নেই।

ব্যবহারকারীরা বলছেন, হেলমেটগুলো খুবই নিম্নমানের। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এগুলো প্রকৃতপক্ষে হেলমেট আকৃতির ক্যাপ। এগুলো পরা আর না পরা প্রায় সমান। দুর্ঘটনার সময় এগুলোতে মাথা ও মুখমণ্ডলের সুরক্ষা পাওয়া যাবে না।

বিআরটিএর হিসেবে, রাজধানীতে এখন ১৬টি রাইড শেয়ারিং কোম্পানির অধীনে চলাচল করছে এক লক্ষ চার হাজার ৩৮৯ মোটরসাইকেল। যাত্রীদের অভিযোগ, রাইড শেয়ারিং কোম্পানি যেসব হেলমেট সরবরাহ করছে তা নিম্নমানের ও অনিরাপদ।

বিএসটিআই-এর বাধ্যতামূলক মান পরীক্ষার তালিকার ১৪০ নম্বর পণ্য মোটরসাইকেল ও স্কুটারের হেলমেট। ১৯৮৬ সালে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর ৩৩ বছরেও এর মান পরীক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই প্রতিষ্ঠানটির।

ঢাকা মহানগর ট্রাফিক বিভাগ বলছে, হেলমেট ব্যবহার না করলে মামলা দেয়া হয়। তবে, মানের বিষয়ে কোন নির্দেশনা না থাকায় যাচাইয়ের সুযোগ নেই। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্বিবিদ্যালয় বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট বলছে, দেশে মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার হচ্ছে না।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, দুর্ঘটনায় মানসম্মত হেলমেট মৃত্যুঝুঁকি কমায় ৪০ শতাংশ আর মারাত্মক যখম থেকে রক্ষা করে ৭০ ভাগ।

বংশাল ও বাংলামোটরে বেশ কয়েকটি হেলমেটের দোকান ঘুরে দেখা গেছে, অ্যাপভিত্তিক পরিবহনসেবায় যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো হেলমেট হিসেবে যা সরবরাহ করছে, সেগুলো মূলত ক্যাপ। দেশেও ক্যাপ তৈরি হয়। এর দাম ২০০ থেকে ৩৫০ টাকার মধ্যে।

দোকানিরা বলেছেন, ক্যাপের দামই সবচেয়ে কম। এগুলো খুব হালকা। এই ক্যাপ দিয়ে যথাযথ সুরক্ষা পাওয়া যাবে না। পূর্ব তেজতুরী বাজারের বাইকশপ বিডির এক বিক্রেতা বলেন, হেলমেটের সর্বনিম্ন দাম ৬০০ টাকা।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, গাড়ির জন্য যেমন সিটবেল্ট, তেমনি মোটরসাইকেলের জন্য হেলমেট জীবন রক্ষাকারী উপাদান। এটি মানসম্মত না হলে হিতে বিপরীত হবে। তিনি বলেন, হেলমেটের মান নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব বিএসটিআইয়ের। পাশাপাশি পুলিশ ও সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষকে ভূমিকা রাখতে হবে।

জানা গেছে, বিএসটিআইয়ের বাধ্যতামূলক মান পরীক্ষার তালিকায় থাকা ১৯৪টি পণ্যের মধ্যে ১২০ নম্বরে রয়েছে মোটরসাইকেল ও স্কুটারের চালক ও আরোহীর হেলমেট। হেলমেটের জন্য একটি নির্দিষ্ট মান অনুসরণ করতে হয়। ফলে বিএসটিআইয়ের মাধ্যমে মান নির্ধারণের পর প্রতিষ্ঠানটির মানচিহ্নসহ বাজারে বিক্রি হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে বাজারে বিএসটিআইয়ের মানচিহ্নসহ কোনো হেলমেট দেখা যায়নি।

রাইড শেয়ারিং সেবায় যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সরবরাহ করা হেলমেটের মান সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএসটিআইয়ের পরিচালক (সিএম) এস এম ইসাহাক আলী বলেন, দেশে কোনো হেলমেট তৈরি হয় না। এগুলো বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। বাধ্যতামূলকভাবে হেলমেটের মান পরীক্ষার জন্য পরবর্তী আমদানি নীতিতে হেলমেট অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তখন পরীক্ষা করে এসব হেলমেটের মান সম্পর্কে জানা যাবে। বাজারে ২০০ থেকে ৩৫০ টাকায় যেসব ক্যাপ বিক্রি হয়, সেগুলোই হেলমেট হিসেবে যাত্রীদের দেওয়া হয়।

মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে কথা হয় ‘পাঠাও’য়ের একজন চালকের সঙ্গে। তিনি যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করছিলেন। জহুরুল ইসলাম নামের ওই চালকের কাছে নিজের জন্য মজবুত ও যাত্রীর জন্য পাঠাওয়ের লোগো–সংবলিত একটি হেলমেট দেখা গেছে। পাঠাওয়ের লোগো–সংবলিত হেলমেটটি তুলনামূলকভাবে অনেক হালকা। তিনি বলেন, হেলমেটটি তিনি বিনা মূল্যে পেয়েছেন।

উবার ও পাঠাওয়ে নিয়মিত যাতায়াত করেন আরিফ দেওয়ান। তিনি বলেন, দুই প্রতিষ্ঠানেরই হেলমেট অনেক হালকা। মাথায় ঠিকভাবে লাগতে চায় না। অন্য প্রতিষ্ঠানের হেলমেটের মানও প্রায় একই ধরনের বলে তিনি জানিয়েছেন।

পাঠাওয়ের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা সৈয়দা নাবিলা মাহবুব বলেন, প্রথমে ১০ হাজার রাইডারকে তাঁরা বিনা মূল্যে হেলমেট দিয়েছেন। এখন যাত্রীদের জন্য ৩৫০ টাকার একটি করে হেলমেট দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, হেলমেটগুলো দেওয়া হয়েছে, যাতে যাত্রীরা অন্তত হেলমেট ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়। এগুলো দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কি না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, অনেক দামি হেলমেট ব্যবহার করলেও দুর্ঘটনায় হতাহতের ঝুঁকি থাকে।

দ্য ওয়ার্ল্ডবিডি/ঢাকা/কেএ/জেডসি

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close